সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Baby-Food-Restrictions-1year.jpg

জেনে রাখুন শিশুর জন্মের এক বছর হওয়ার আগে যেসব খাবার দেয়া যাবে না

মায়েরা নিজে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় বা অন্য কেউ কিছু খাওয়ানোর সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে খাবার গুলো শিশুর ওই বয়সের জন্য উপযুক্ত কিনা, যদি উপযুক্ত হয়ও তা সঠিক আকৃতি বা অবস্থায় দেয়া হচ্ছে কিনা।

জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর একমাত্র খাবার থাকে বুকের দুধ। ছয় মাস থেকেই তাকে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবারে অভ্যস্থ করাতে হয়। কারন ওই বয়স থেকেই শিশুর প্রয়োজনীয় সব উপাদান বুকের দুধে পূরণ হয় না।

সুস্থ সবলভাবে একটি শিশু বড় হওয়ার জন্য সঠিক পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু অনেক সময় নতুন মায়েরা বা বাচ্চাকে যারা খাওয়ান তারা বুঝতে পারেন না কোন খাবার টা তাদের দেয়া যাবে আর কোনটা দেয়া যাবে না। তাই মায়েরা নিজে বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় বা অন্য কেউ কিছু খাওয়ানোর সময় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে খাবার গুলো শিশুর ওই বয়সের জন্য উপযুক্ত কিনা, যদি উপযুক্ত হয়ও তা সঠিক আকৃতি বা অবস্থায় দেয়া হচ্ছে কিনা।

তাই শিশুর জন্মের এক বছর হওয়ার আগে যেসব খাবার দেয়া যাবে না বা দেয়া গেলেও সঠিক আকার আকৃতির অর্থাৎ শিশুর খাবারউপযোগী করে দিতে হবে সেগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে:
  • বড় ফল: ফল যেমন আঙ্গুর, বেরি ইত্যাদি ফলও যদি আস্ত দেয়া হয় শিশুরা কম দাঁত নিয়ে চিবিয়ে খেতে পারবে না। তাই এসব ফল দিতে হলেও ছোট ছোট টুকরো করে কামড়ের আকারে দিতে হবে।
  • বড় ফল ও সবজির বড় টুকরো: সবজির বড় টুকরো যেমন গাজর, শশা ইত্যাদির এবং ফলের বড় টুকরো যেমন আপেল, নাশপাতি ইত্যাদি দেয়া উচিত নয় এই বয়সে। ভালভাবে রান্না করে ছোট টুকরো করে বা ম্যাশ করে দিতে হবে।
  • বাদাম: শিশুদের সীমিত দাঁত নিয়ে এই বয়সে আস্ত বাদাম খেতে দেয়া বিপদজনক কারন তারা ভালো ভাবে চিবিয়ে খেতে শেখে না তখনও। এমনকি শিশুরা ৩-৫ বছরের হলেও আস্ত বাদাম না দিয়ে গুঁড়ো করে বা ছোট টুকরো করে খেতে দিতে হবে।
  • পপকর্ণ: শিশুর এই বয়সে পপকর্ণ দেয়াও বিপদজনক। কারন এটি তারা চিবিয়ে খেতে পারবেনা ভালো ভাবে, গলায় আঁটকে যেতে পারে।
  • কিশমিশ: এই বয়সে তাদের কিশমিশ দেয়াও ভালো নয়। কিছুটা বড় হওয়ার পর দিতে হবে।
  • শক্ত চকলেট বা জেলি: এই খাবারগুলোও শিশুদের দেয়া যাবে না, বর্জন করতে হবে এই বয়সে।
অনেক খাবারে অ্যালার্জি থাকতে পারে: 
কিছু খাবার আছে যেগুলো শিশুর প্রথম দিকে দেয়া উচিত নয় যা অ্যালার্জির সৃষ্টি করতে পারে। যদি পরিবারের অন্য কারো কোন এক বা একাধিক খাবারে অ্যালার্জি থাকে তাহলে সেই খাবার গুলো শিশুর কিছুটা বয়স বৃদ্ধির পর সতর্কতার সাথে দিতে হবে। দেখতে হবে তার কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় কিনা।

যদিও একজনের একটি খাবারে অ্যালার্জি থাকলে অন্যজনেও সেই খাবারে থাকবেই এমন কোন কথা নেই। আর চাইলে সেগুলো দেয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিলে ভালো হয়।
  • চিংড়ী মাছ: সব বয়সে সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জি উৎপাদক খাবার হচ্ছে চিংড়ী মাছ। তাই শিশু বেশ কিছুটা বড় না হওয়া পর্যন্ত এই খাবারটি না দেয়াই ভালো।
  • ডিম: এই বয়সে কিছুটা অ্যালার্জি উৎপাদক খাবার হচ্ছে ডিম। তবে সবার সমস্যা হবেই তা নয়। তাই পরিবারে যদি কারো ডিমে অ্যালার্জি থাকে সেক্ষেত্রে কিছুদিন অপেক্ষা করে দেয়াই উত্তম। যদি অ্যালার্জির কোন সমস্যা না থাকে তাহলে ডিম খেতে কোন সমস্যা হওয়ার কথা না। তবে দিতে হবে ধীরে ধীরে।
  • বাদাম: চিনাবাদাম বা এই ধরনের কিছু বাদাম অ্যালার্জির সৃষ্টি করে থাকে তাই সবচেয়ে ভালো হয় এসব খাবার শিশুর এক বছর বয়স হওয়ার আগে না দেয়া। আর যদি পরিবার কোন সদস্যের বাদামে অ্যালার্জি থাকে তাহলে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করে দিতে হবে বা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে দিতে হবে।
  • স্ট্রবেরি: স্ট্রবেরি ফলটিও অ্যালার্জি উৎপাদক। তাই শিশুদের এক বছর বয়স পর্যন্ত না দেয়াই ভালো।
  • টক ফল: অনেক সময় টক ফল যেমন টক কমলা, লেবু ইত্যাদি সব শিশুদের সহ্য হয়না। এর ফলে অনেক শিশুদের দেহে ফুসকুড়ি হতে পারে। তাই একদম কম বয়সে এগুলো না দেয়াই ভালো।
  • চকলেট: অনেক শিশুদের চকলেটে অ্যালার্জির সৃষ্টি হতে পারে। তাই কমপক্ষে কয়েক বছর চকলেট না দেয়াই ভালো। আর চকলেট দাঁতের সুরক্ষাকারী ইন্দ্রিয়কে কাজ করতে বিলম্ব ঘটায়।
কিছু বিপদজনক খাবার:
  • সামুদ্রিক মাছ: টুনা, স্যামন, কোরাল ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছে উচ্চ পরিমানে পারদ থাকে তাই এগুলো শিশুদের দেয়া ঠিক নয়।
  • মধু: অনেকের মাঝেই প্রচলিত আছে যে শিশুর জন্মের পরই মুখে মধু দেয়া। এটা শিশুর জন্য খুবই ক্ষতিকর। কমপক্ষে এক বছর পর্যন্ত শিশুকে মধু দেয়া যাবে না। কারন এতে Clostridium botulinum নামক জীবাণু থাকে যা বড়দের জন্য ক্ষতিকর না হলেও শিশুদের জন্য বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
  • গরুর দুধ: শিশুর প্রথম জন্মদিনের আগে গরুর দুধ না দেয়াই ভালো। কারন গরুর দুধে থাকে বেশি প্রোটিন এবং সোডিয়াম যা শিশুর ছোট অন্ত্রে তা পরিপাক করতে ব্যাঘাত ঘটায়। এছাড়া গরুর দুধে মায়ের দুধ ও ফর্মুলা দুধের থেকে কম আয়রন এবং অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড কম থাকে যা শিশুর বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে যদি কম বয়সে গরুর দুধ দেয়া হয় তাহলে অ্যাসিডিটির ও অ্যালার্জির সৃষ্টি করতে পারে।
  • লবন: শিশুর খাবার তৈরিতে খুব কম পরিমান লবন ব্যবহার করা উচিত। কারন লবনেও রয়েছে প্রচুর সোডিয়াম যা শিশুর পাকস্থলীতে খাবার পরিপাকে সমস্যার সৃষ্টি করে।
  • পাস্তুরাইজেশন ছাড়া দুধ: অনেক ধরনের বিপদজনক ব্যাকটেরিয়া থাকে পাস্তুরাইজেশন ছাড়া দুধে তাই ছোট শিশুদের দেয়া উচিত না।
  • চা এবং কফি: চা, কফি, কোকোয়াতে থাকে ক্যাফেইন যা ক্যালসিয়ামের হজমে বাধা দেয়। তাই এই সব পানীয় শিশুদের এবং ছোট বাচ্চাদেরও পান করতে দেয়া উচিত নয়।
  • কার্বোনেটেড ড্রিংকস: পেপসি, স্প্রাইট, কোক, সোডা পানি এসব কার্বোনেটেড ড্রিংকসে প্রচুর চিনি, সোডিয়াম এবং আর্টফিশিয়াল ফ্ল্যাভার দেয়া থাকে যা শিশুদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এসব ড্রিংকসের গ্যাসের কারনে কার্বোনেশন ঘটে যা শিশুদের ছোট পাকস্থলীতে সমস্যার সৃষ্টি করে।

-
লেখক: জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ; এক্স ডায়েটিশিয়ান,পারসোনা হেল্‌থ; খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান (স্নাতকোত্তর) (এমপিএইচ); মেলাক্কা সিটি, মালয়েশিয়া।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

মা, শিশু, উপযুক্ত, পুষ্টিকর, খাবার, ছয়-মাস, এক-বছর, শক্ত-খাবার, অ্যালার্জি, বিপদজনক