সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

iftar-ligh-menu.jpg

রোজায় আহারে সংযমী হতে হবে

রোজায় অধিক খাদ্য গ্রহন না করে, বাজার দর না বাড়িয়ে, বরং পরিমিত খাবার খেয়ে, অধিক পরিমান দান করে গরিবদেরকে অন্তত এ মাসে কিছুটা ভাল খাবার খাওয়ার সূযোগ করে দিয়ে তাকওয়া অর্জনের দিকে আরো অগ্রসর হতে হবে।

অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ভোজনের ব্যাপারে সংযমী হওয়া রোজার অন্যতম শিক্ষা। অথচ রোজার মাসে আমরা ভোজনের ব্যাপারে অত্যন্ত অসংযমী বা বেসামাল হয়ে উঠি। রোজার প্রকৃত তাৎপর্য না বুঝে অনেক রোজাদার এতো বেশী খাবার খায় যে সকালের ও দুপুরের খাবার শুধু এক ইফতারেই পুষিয়ে নেয়।

অথচ দোজাহানের বাদশাহ মহানবী (সঃ) খুব সামান্যই ইফতার করতেন। আনাস (রাঃ) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (সঃ) সালাতের (মাগরিবের) পুর্বে তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর পাওয়া না যেত তবে শুকনো খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। আর যদি শুকনা খেজুর পাওয়া না যেত তাহলে কয়েক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করতেন। (আহমাদ)

অথচ চকবাজারের জিভে জল আসা ইফতারির পসরা দেখলে, সেখানকার ক্রেতাদের চেহারা দেখলে, বুঝতে খুব বেশি জ্ঞানী হবার প্রয়োজন পড়ে না যে এগুলো দ্বারা কাদের রসনা পরিতৃপ্ত হয়। এসব ইফতারি ধনী না দরিদ্র শ্রেনীর জন্য প্রস্তুতকৃত। উপরন্তু এগুলো টিভিতে প্রচারণা দরিদ্র পরিবার ও তাদের সন্তানদের  প্রতি দয়ার পরিবর্তে চুড়ান্ত উপহাস বৈ কিছু নয়!

হিসাব করলে দেখা যায় অন্যান্য মাসের চেয়ে এমাসে আমরা গড়পড়তা বেশি কিলোক্যালোরি গ্রহন করি। বিশেষ করে ধনী শ্রেনীর ক্ষেত্রে অধিকমাত্রায় পুষ্টি সমৃদ্ধ বাহারি খানাপিনা স্ট্যাটাসের একটা অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। অথচ রোজায় পানাহার থেকে বিরত থাকার একটি উদ্দেশ্য হল ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর অভূক্ত লোকদের কষ্ট উপলব্ধি করা এবং কষ্ট লাঘবে দীপ্ত প্রত্যয়ে উদিপ্ত হওয়া।

কিন্তু ধনীরা রোজার মাসে খাদ্য দ্রব্যের পেছনে এত বেশি ব্যয় করে যে ভোগ্যপণ্যের মূল্য সারা বছরের তুলনায় এ মাসে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে কষ্ট লাঘবের পরিবর্তে প্রকারন্তরে এ মাসে আমাদের আচারণ খাদ্য গ্রহনের ক্ষেত্রে ভুখানাঙ্গা, সীমিত আয়ের লোকদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দেয়। 

অথচ মহানবী (সঃ) এর সময় রোজা আসত গরীবদের জন্য আল্লাহর খাস রহমত হিসেবে। সাহাবারা এ মাসে বেশি বেশি দান করে প্রমাণ করতেন ধন-সম্পদ শুধু নিজের ভোগের জন্য নয়, এতে গরিবদেরও হক আছে।

কেননা মহানবী (সঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোন একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্যমাসের একটি ফরয আদায় করল। আর রমযানে যে ব্যক্তি একটি ফরয আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায় করল।

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমাদের রোযা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। (সূরা বাকারা, ২ ঃ ১৮৪ আয়াত)।

আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেন, রোযা রাখ, তাহলে (সওয়াব ছাড়াও) স্বাস্থ্য লাভ করবে। (তাবারানী)।

এখন কল্যাণ লাভ করতে হলে, স্বাস্থ্য লাভ করতে হলে শুধু রোজা থাকলেই চলবে না, অবশ্যই মহানবী (সঃ) এর খাদ্য বিধিও মেনে চলতে হবে। 

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'পেটের চেয়ে মন্দ কোন থলি মানুষ পূর্ণ করে না। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে যতটুকু খাবার প্রয়োজন ততটুকু খাদ্যই কোন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। এরপরও কোন ব্যক্তির উপর তার নফস (প্রবৃত্তি) জয়যুক্ত হয় তবে সে তার পেটের এক তৃতীয়াংশ খাদ্য গ্রহণ, এক তৃতীয়াংশ পানীয় গ্রহণ এবং এক তৃতীয়াংশ তার শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য (নির্ধারণ করবে)।' ( তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)।

ইবনে উমার (রা:) নবী (দ:) হতে বর্ণনা করেন, কাফের আহার করে সাত উদরে আর মুমিন আহার করে এক উদরে।' ( বুখারী  ও মুসলিম)।

সূতরাং আমাদেরকে অবশ্যই আহারে সংযমী হতে হবে।

রাসুল(সঃ) আরো বলেছেন, দুনিয়াতে যেসব লোক পেট পুরে খায়, তারাই কিয়ামতের দিন অধিক ক্ষুধার্ত থাকবে। (ইবনে মাজাহ)

শুধু কম খেলেই হবে না, অপচয়ও রোধ করতে হবে। অপচয় সম্পর্কে রাসুল(সঃ) বলেছেন, যখনই যা তোমার খেতে ইচ্ছে হয়, তখনই তাই খাওয়াই অপচয়। ( ইবনে মাজাহ) সূতরাং রোজার মাসে ইচ্ছামত খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা মোটেই কাম্য নয়।

আহারে সংযমী হওয়া যে স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল তা বৈজ্ঞানিক ভাবেও স্বীকৃত। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী এ কে এম আবদুর রহীম লিখেছেন, সমস্ত শরীরে সারা বছর যে জৈব বিষ দেহের সড়বায়ু  ও অপারপর জীব কোষকে দুর্বল করে দেয়। রোযা সমস্ত রক্ত প্রবাহকে পরিশোধন করে সমগ্র প্রবাহ প্রনালীকে নবরূপ দান করে।

তাছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞান মতে, মানুষ যদি খাবার খাওয়া থেকে সম্পর্ণূরুপে নিজকে বিরত রাখে তা হলেও তার শক্তি ভান্ডার থেকে তার চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের পরিপ্রেক্ষিতে কমপক্ষে একমাস এবং উর্ধ্বে  তিন মাস শক্তি সরবরাহ করতে পারে।

সুতরাং রোজায় অধিক খাদ্য গ্রহন না করে, বাজার দর না বাড়িয়ে, বরং পরিমিত খাবার খেয়ে, অধিক পরিমান দান করে গরিবদেরকে অন্তত এ মাসে কিছুটা ভাল খাবার খাওয়ার সূযোগ করে দিয়ে তাকওয়া অর্জনের দিকে আরো অগ্রসর হতে হবে।

-
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

iftar, ramadan, health, hungry, limit, over, religious, islam, rules